শনিবার , ২৬ জুলাই ২০২৫ | ৪ঠা বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. অপরাধ
  2. ভিডিও

অত্যাধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা, স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
জুলাই ২৬, ২০২৫ ২:২০ পূর্বাহ্ণ

দেশের তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের হাতে অত্যাধুনিক ও প্রাণঘাতী অস্ত্রের বিপুল মজুত রয়েছে, যা পাহাড়ে চাঁদাবাজি, খুন, গুম, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহৃত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যে উঠে এসেছে যে, এসব সন্ত্রাসীর লক্ষ্য তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে একটি স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা করা।

অস্ত্রের ধরন ও মজুত: সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে একে-৪৭, একে-৫৬, একে-২২, এম-১৬, মার্ক-২ রাইফেল, এম-৪ কার্বাইন, ৪০ এমএম গ্রেনেড লঞ্চার, চায়না রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, এসএলআর, এসএমজি, এলজি, বিমানবিধ্বংসী রিমোট কন্ট্রোল বোমা, গ্রেনেড, হেভি মেশিনগান, জি-৩ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, রকেট লঞ্চার, হাতবোমা, শক্তিশালী ওয়াকিটকি, দেশি পিস্তল, বন্দুক এবং মর্টার। এছাড়া ড্রোন, সিগন্যাল জ্যামারসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সরঞ্জামও তাদের দখলে রয়েছে। খাগড়াছড়ির মণিপুরের তারাবন এলাকায় একটি বিশাল অস্ত্রগুদামের কথাও জানা গেছে।

‘জুম্মল্যান্ড’ এজেন্ডা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা: বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও বিবৃতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি ‘জুম্মল্যান্ড’ গঠনের অন্তর্নিহিত ষড়যন্ত্র স্পষ্ট। কল্পিত ‘জুম্মল্যান্ড’-এর মানচিত্র (ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানচিত্র যোগ করে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। ৫ আগস্ট সরকারের পট পরিবর্তনের পর দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ: স্থানীয় সূত্র ও গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চারটি আঞ্চলিক সংগঠন—ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসিত), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা বা মূল) ও জেএসএস (সংস্কার)—পাহাড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের উদ্দেশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করে চলেছে। তাদের এই কর্মকাণ্ড পাহাড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সশস্ত্র সংঘর্ষ বাড়ার কারণে অস্ত্রের ঘাটতি পূরণে তারা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে অবৈধভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনছে। তিন পার্বত্য জেলা থেকে বছরে ৭০০ কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হয়, যার একটি বড় অংশ অস্ত্র কেনায় ব্যয় হয়।

সাম্প্রতিক অস্ত্র উদ্ধার অভিযান: ২০২৫ সালে প্রতিবেশী দেশের পুলিশ বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে জড়ো করা অস্ত্রের পাঁচটি বড় চালান আটক করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উদ্ধার: ১৫ জানুয়ারি ইউপিডিএফ (মূল) থেকে ৪০ এমএম গ্রেনেড লঞ্চার, একে-৪৭ ও এম-১৬ রাইফেলসহ বিপুল গোলাবারুদ; ২১ জানুয়ারি একই দলের কাছ থেকে ৯ এমএম পিস্তল ও নগদ টাকা; ২৩ জানুয়ারি ইউপিডিএফ (মূল) থেকে একে-৪৭ রাইফেল ও গোলাবারুদ; ১২ ফেব্রুয়ারি জেএসএস (মূল) থেকে একে-৪৭ ও এম-৪ কার্বাইনসহ বৃহৎ আকারের গোলাবারুদের চালান। ২৩ মার্চ আরও একটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তার, ডেটোনেটর ও সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার হয়, যদিও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পরিচয় জানা যায়নি।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে বাধা ও নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর হামলা: পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী জেএসএসের অস্ত্র জমাদানের কথা থাকলেও, তা সম্পূর্ণ হয়নি, যার ফলে পাহাড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিয়মিত চাঁদাবাজি, হত্যা, গুম ও অপহরণের কারণে সাধারণ জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। শান্তিচুক্তির পরও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে; এখন পর্যন্ত ৪২ জন সদস্য নিহত ও ১১১ জন আহত হয়েছেন

সশস্ত্র ক্যাডার ও অপারেশনসমূহ: পার্বত্য চট্টগ্রামে চারটি আঞ্চলিক সংগঠনের প্রায় ৪ হাজার ‘আর্ম ক্যাডার’ এবং ১০ হাজারের বেশি ‘সেমি আর্ম ক্যাডার’ রয়েছে, যারা অস্ত্রে প্রশিক্ষিত। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালের ৩০ জুন থেকে তিন পার্বত্য জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৫টি বড় অপারেশন পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে সর্বশেষ ‘অপারেশন উত্তরণ’ ২০০১ সালের ১ আগস্ট থেকে এখনো চলমান রয়েছে।

সর্বশেষ - জাতীয়