রবিবার , ২৯ জুন ২০২৫ | ৫ই বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. বানিজ্য/অর্থনীতি
  2. ভিডিও

স্থবির দেশীয় বাণিজ্য, বন্দরগুলোতে তীব্র অচলাবস্থা

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
জুন ২৯, ২০২৫ ৮:২২ পূর্বাহ্ণ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) শুরু হওয়া লাগাতার ‘শাটডাউন’ কর্মসূচির ফলে সারা দেশের শুল্ক ও কর কার্যালয়গুলোতে কার্যক্রম প্রায় সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। এর জেরে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ভয়াবহ অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। গতকাল সকাল থেকেই এনবিআরের প্রধান কার্যালয়সহ দেশের সব কাস্টমস হাউস, কর কমিশনারেট, ভ্যাট ও এক্সাইজ দপ্তরে সেবা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সকাল ৯টা থেকে এনবিআরের প্রতিটি ফটকে তালা ঝোলানো দেখা গেছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাইরে অবস্থান নিয়ে ‘মার্চ টু এনবিআর’ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। এতে রাজধানীসহ সারা দেশের ব্যবসাবাণিজ্য কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

বিক্ষোভের মূল দাবি ও বর্তমান পরিস্থিতি

এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণ এবং রাজস্ব খাতের ব্যাপক সংস্কার দাবি করছেন। তাঁদের অভিযোগ, এনবিআর চেয়ারম্যান তাঁদের দাবি উপেক্ষা করে মিথ্যাচার করছেন এবং নিপীড়নমূলক বদলি আদেশ দিচ্ছেন। এর প্রতিবাদে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে লাগাতার কর্মবিরতি ও ঢাকামুখী এই ‘মার্চ’ কর্মসূচি।

অন্যদিকে, এনবিআর এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বিলুপ্ত করে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের সরকার ঘোষিত সিদ্ধান্ত নিয়েও আন্দোলনকারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। তাঁরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বন্দরগুলোতে ভয়াবহ অচলাবস্থা

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাস্টমস কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে পণ্য খালাস কার্যক্রমও সম্পূর্ণ থেমে গেছে। বর্তমানে কেবল পূর্ব-অনুমোদিত জাহাজের ক্ষেত্রে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ চলছে। নতুন কোনো জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারছে না। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জাহাজ পরিবহন কোম্পানি ‘মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি’র হেড অব অপারেশনস, আজমীর হোসেন চৌধুরী, আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “শুল্কায়ন না হলে রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন জাহাজগুলোর নিবন্ধন না হওয়ায় বন্দরে কার্যক্রম আরও বাধাগ্রস্ত হবে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভারত থেকে কোনো আমদানি পণ্য আসেনি এবং কোনো রপ্তানি পণ্য ভারতে যায়নি। এর ফলে ভারতের মোহদিপুরে শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক এবং সোনামসজিদে রপ্তানি পণ্যবাহী ৬টি ট্রাক আটকা পড়েছে। সোনামসজিদ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মাঈনুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, কর্মসূচির কারণে আমদানি-রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আখাউড়া স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেছেন যে কাস্টমস কর্মকর্তারা কর্মবিরতিতে থাকায় নতুন কোনো কাগজপত্রে স্বাক্ষর করা হয়নি। ব্যবসায়ী নেসার আহমেদ ভূঁইয়া জানান, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর কারণে নতুন করে কোনো পণ্য ভারতে যায়নি, তবে যেসব পণ্যের কাগজপত্র আগেই সম্পন্ন ছিল, সেগুলোই রপ্তানি করা হয়েছে।

বেনাপোল প্রতিনিধি নিশ্চিত করেছেন যে, বেনাপোল কাস্টমস হাউসে গতকাল কোনো কাজ হয়নি। পণ্য শুল্কায়ন, পরীক্ষণ ও লোড-আনলোড বন্ধ রয়েছে। বৃহস্পতিবারের অনুমোদন করা ছয় ট্রাক পণ্য সকালে আমদানি হলেও কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি, যার ফলে ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এবং পণ্যজট বাড়ছে।

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দিনাজপুরের হিলিতেও কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন। হিলি কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান অবিলম্বে কর্মসূচি প্রত্যাহারে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

লালমনিরহাট প্রতিনিধি সূত্রে জানা গেছে, পাটগ্রামের বুড়িমারী স্থল শুল্ক স্টেশনেও (কাস্টমস) আমদানি-রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বহু পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়েছে, যার মধ্যে পচনশীল পণ্য থাকায় ব্যবসায়ীরা লোকসানের আশঙ্কায় ভুগছেন। শ্রমিকরাও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ইয়ার্ডে ভুটান থেকে আমদানি করা ১৪৮টি বোল্ডার পাথরবোঝাই ট্রাক আটকা পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া অবস্থান ও এনবিআরের সতর্কবার্তা

‘মার্চ টু এনবিআর’ কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর কার্যালয়ের চারপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হয়েছে। কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাউকে ভিতরে ঢুকতে বা বাইরে বের হতে দিচ্ছেন না।

গতকাল এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা আল আমিন শেখ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, দেরিতে অফিসে আসা বা অনুমতি ছাড়া অফিস ত্যাগ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অর্থবছরের শেষ সময়ে রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে সব কর ও শুল্ক দপ্তর খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আন্দোলনের কারণে জনসাধারণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

আলোচনার আহ্বান ও চলমান সংকট

এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত বৃহস্পতিবার এক বৈঠকে আগামী মঙ্গলবার এনবিআর, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সেই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে আন্দোলনকারী কর্মকর্তারা পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন। যদিও ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে যে, তারা আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের সভাপতি হাসান মুহাম্মদ তারেক রিকাবদার বলেন, “চেয়ারম্যানের অপসারণ ছাড়া এখন আর কোনো পথ খোলা নেই। শাটডাউনের আওতাবহির্ভূত রয়েছে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা। আমরা সব পক্ষের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য সংস্কার চাই।” তিনি আরও বলেন, “আমরা আলোচনায় বসতে চাই, মঙ্গলবারের বৈঠকে যোগ দিতে প্রস্তুত।” রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে এনবিআর বিষয়ে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ঐক্য পরিষদ। শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, “এ কর্মসূচি দীর্ঘায়িত হলে আমদানি-রপ্তানিতে ভয়াবহ সংকট তৈরি হবে। বন্দরে পুরোপুরি অচলাবস্থা দেখা দেবে।”

এই অচলাবস্থা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ - জাতীয়