দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদীতে রুই জাতীয় (রুই, কাতল, মৃগেল ও কালিবাইশ) মা-মাছ পুরোদমে ডিম ছেড়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ মে) মধ্যরাতে অমাবস্যার দ্বিতীয় জোরের শেষ দিনে মেঘের গর্জন, বজ্রপাত এবং অতিভারী বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের অনুকূল পরিবেশে মা-মাছ ডিম ছাড়ে। এই নিষিক্ত ডিমের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কেজি, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ডিম সংগ্রহকারীদের উচ্ছ্বাস ও প্রতিকূল আবহাওয়া
বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ২টার দিকে হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার হালদা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে মা-মাছ ডিম ছাড়তে শুরু করে। প্রায় দুই মাস ধরে অপেক্ষারত অর্ধশতাধিক ডিম সংগ্রহকারী মা-মাছের ডিম ছাড়ার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে উৎসবমুখর পরিবেশে নদীতে নেমে পড়ে। প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ ডিম সংগ্রহকারী ৩৫০-৪০০ নৌকা, জাল ও পাতিলসহ নানা সরঞ্জাম নিয়ে ডিম সংগ্রহে মেতে ওঠেন। যদিও ভোর রাতের দিকে কিছুটা বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্বাভাবিক ডিম সংগ্রহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে।
ডিমের পরিমাণ ও গবেষকদের পর্যবেক্ষণ
মৎস্য অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট যৌথভাবে সব তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত করেছে যে, এবারের হালদা নদীতে মা-মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কেজি। হালদা গবেষকরাও বলছেন, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এবার ভালো পরিমাণে ডিম সংগৃহীত হয়েছে, যা ডিম সংগ্রহকারীদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
হাটহাজারী উপজেলার গড়দুয়ারা নয়হাট এলাকার প্রবীণ ডিম সংগ্রহকারী কামাল উদ্দিন সওদাগর বলেন, “সারা বছর আমরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করি। ভালো ডিম সংগ্রহ হয়েছে এবার।” তিনি জানান, বিশেষ করে কাগতিয়া, সিপাহী ঘাট, নয়াহাট, পুরালিয়া স্লুইসগেট ও কেরামতালির বাকসহ আরও কিছু এলাকায় ডিম সংগ্রহকারীরা প্রত্যাশিত পরিমাণে মা মাছের ডিম সংগ্রহ করেছেন। তার নিজের ১০টি নৌকায় প্রায় ৩৫-৩৭ বালতি মা-মাছের নিষিক্ত ডিম সংগৃহীত হয়েছে।
ডিম সংগ্রহ ও পরবর্তী প্রক্রিয়া
ডিম সংগ্রহ কার্যক্রম শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত চলে। এই সময়ে প্রতি নৌকায় ৩-১২ বালতি (৮-১০ লিটার পরিমাপের বালতি) পর্যন্ত মা-মাছের ডিম সংগৃহীত হয়েছে। গড় হিসাবে প্রতি নৌকায় ৭-৮ বালতি ডিম পাওয়া গেছে, যা ডিম সংগ্রহকারীদের মতে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
অভিজ্ঞ ডিম সংগ্রহকারীরা সংগৃহীত নিষিক্ত ডিম সরকারি হ্যাচারি, মাটি ও সিমেন্টের কুয়ায় পরিস্ফুটনের জন্য নিয়ে গেছেন। সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন আজাদী জানান, ১৮ ঘণ্টা পর ডিম থেকে রেণু ফুটবে। তিন দিন ধরে রেণুগুলোকে নার্সিং করা হবে এবং ৯৬ ঘণ্টা পর সেগুলো বিক্রয়যোগ্য পোনায় পরিণত হবে। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এসব রেণুর পোনা দ্রুত বড় হয় বলে সারাদেশের মাছচাষিদের কাছে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা ও মূল্য রয়েছে।
হালদা সুরক্ষায় প্রশাসনের তৎপরতা
হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবিএম মশিউজ্জামান জানান, ডিম ছাড়ার পর ক্লান্ত মা মাছগুলোকে কেউ শিকার করতে না পারে এবং কৃত্রিম রেণু বিক্রেতারা সক্রিয় হতে না পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন কঠোর নজরদারি করছে।
তিনি বলেন, হালদাকে তার পুরোনো রূপে ফেরাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত এক বছরে মা মাছ রক্ষা করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে এবং ড্রেজার, ঘেরা ও ভাসা জাল, বড়শি, বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত নৌকা ধ্বংস করা হয়েছে। ইউএনও বলেন, “সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হালদা পুরনো রূপ ফিরে পাচ্ছে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, “এবার বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো পরিমাণে ডিম সংগ্রহ হয়েছে। আমি মনে করি, আজকের ডিম প্রাপ্তি হালদা নদী রক্ষায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনার একটি ফসল।” তিনি জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, নৌ-পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, এনজিও আইডিএফ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং হালদাকে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার একটি সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।



















