রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গতকাল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশ এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়, যেখানে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা করেন, “ক্ষমতায় গেলে জামায়াত মালিক নয় বরং সেবকের ভূমিকা পালন করবে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আগামীর বাংলাদেশে আরেকটা লড়াই হবে। সে লড়াই হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করার জন্য সেই লড়াইয়েও আমরা বিজয় লাভ করব।”
অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিতকরণসহ সাত দফা দাবিতে এই ‘জাতীয় সমাবেশ’ আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী। শুক্রবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস, পিকআপ, ট্রেন, লঞ্চে করে জামায়াত, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা আসতে শুরু করেন। গতকাল বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাবেশস্থল ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়িয়ে শাহবাগ, মৎস্য ভবন, প্রেস ক্লাব, পল্টন, কার্জন হল, চানখাঁরপুল, পলাশীসহ সব এলাকায় ছিল সমাবেশে আগত কর্মীদের উপচে পড়া ভিড়। দলীয় পতাকা হাতে মাথায় বেঁধে, দলের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে তারা সমাবেশে যোগ দেন।
জামায়াতের সাত দফা দাবিগুলো হলো:
- সব গণহত্যার বিচার।
- প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার।
- জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন।
- জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের পুনর্বাসন।
- সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন।
- এক কোটিরও বেশি প্রবাসী ভোটারদের ভোট প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ।
- জাতীয় নির্বাচনের আগে সমতাভিত্তিক রাজনৈতিক পরিবেশ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করা।
অন্যান্য রাজনৈতিক ও সংগঠনের সমর্থন: জামায়াতের এসব দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সমাবেশে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমাদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, হেফাজত ইসলামের নায়েবে আমির মহিউদ্দিন রাব্বানী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির আবু জাফর কাসেমী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার ও জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব ড. গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক।
জামায়াত আমিরের অঙ্গীকার ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা: সভাপতির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জামায়াতে ইসলামী যদি বাংলাদেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায় তাহলে মালিক হবে না সেবক হবে ইনশাআল্লাহ। লক্ষ জনতাকে সাক্ষী রেখে ঘোষণা দিচ্ছি-আল্লাহর ইচ্ছায়, জনগণের ভালোবাসায় জামায়াত যদি সরকার গঠন করে, তাহলে কোনো এমপি, কোনো মন্ত্রী সরকারি প্লট গ্রহণ করবে না। কোনো এমপি কোনো মন্ত্রী নিজের হাতে টাকা চালাচালি করবে না। আমরা কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেব না। কাউকে দুর্নীতিও করতে দেব না। দুর্নীতি আমরা সহ্য করব না-এ বাংলাদেশটাই আমরা দেখতে চেয়েছি। আমি জামায়াত আমির নই-বাংলাদেশের একজন মানুষ হয়ে কথা বলতে এসেছি। নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির মুক্তির জন্য আমাদের লড়াই নয়। আমাদের লড়াই সবার জন্য।”
তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “আবু সাঈদ সেদিন বুক পেতে না দাঁড়ালে হয়তো আজকের বাংলাদেশ আমরা দেখতাম না। হয়তো আরও অনেকের জীবন ফ্যাসিবাদীদের হাতে চলে যেত। জীবন বাজি রেখে এ যুদ্ধটা যদি না হতো তাহলে আজ যারা বিভিন্ন ধরনের কথা বলছেন আর দাবিদাওয়া তুলে ধরছেন তারা তখন কোথায় থাকতেন?”
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, “যাদের ত্যাগের বিনিময়ে এ নিয়ামত পেয়েছি আমরা তাদের যেন অবজ্ঞা না করি, অবহেলা না করি। শিশু বলে তাদের যেন তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করি। অহংকার করে কেউ যেন অন্য দলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করি। অরাজনৈতিক ভাষায় আমরা যেন কথা না বলি। এগুলো যদি পরিহার করতে না পারি তাহলে বুঝতে হবে ফ্যাসিবাদের রূপ বাসা বেঁধেছে। আমরা আশা করব, কেউ এমন করবেন না। আমরা সবাই যেন রাজনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা করি। জাতীয় ঐক্যের বীজতলা আমরা সবাই একসঙ্গে তৈরি করব ইনশাআল্লাহ।”
সমাবেশের গতিপ্রকৃতি: সমাপনী বক্তব্য দেওয়ার সময় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান দুইবার অসুস্থ হয়ে মঞ্চে পড়ে যান। প্রথমবার উঠে আবার বক্তব্য শুরু করলেও, দ্বিতীয়বার অসুস্থ হলে জামায়াতের চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসা দেন। মঞ্চে বসা অবস্থাতেই তিনি আবারও বক্তব্য চালিয়ে যান এবং পরে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ স্লোগানের মাধ্যমে জাতীয় সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
গতকাল বেলা ২টায় পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মাধ্যমে জাতীয় সমাবেশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সমাবেশে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি আমন্ত্রিত অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর নেতারা বক্তব্য দেন। এছাড়াও, আহত জুলাইযোদ্ধা এবং জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “১৭-১৮ বছর ধরে জামায়াতে ইসলামী তথা ইসলামি শক্তির ওপর অত্যাচার-জুলুম হয়েছে। জামায়াতের নেতাদের তিলে তিলে মারা হয়েছে। জামায়াতের নিবন্ধন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, ক্রসফায়ার, আয়নাঘর, রিমান্ড-এসবে বাংলাদেশের সব থেকে মজলুম দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। তার বিরুদ্ধে এ জনসমুদ্র গণবিস্ফোরণের সৃষ্টি করেছে।”
দলটির নির্বাহী পরিষদের সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, “আমি ফাঁসির মঞ্চ থেকে আজ লাখো জনতার এ মহাসমুদ্রে উপস্থিত হতে পেরেছি। আমাকে হত্যার আয়োজন করা হয়েছিল। আমাদের কোনো শক্তি আটকাতে পারে নাই, পারবে না। জামায়াতের নেতৃবৃন্দ পালায় না। আমাদের উপড়ে ফেলতে পারবেন না।” শহীদ আবরার ফাহাদের পিতা মো. বরকতউল্লাহ বলেন, “আবরার হত্যার ছয় বছর হয়ে গেছে। এখনো বিচার পাইনি।”
সমাবেশে জুলাই শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন জুলাই শহীদ ইমাম হাসান তামিমের ভাই রবিউল আলম ভূইয়া। জুলাইয়ে আহত যোদ্ধাদের মধ্যে বক্তব্য দেন জুনাইদুর রহমান, রেদোয়ান নাবিল, মো. শাহ আলম, এম এস মুস্তাফিজুর রহমান।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, “শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান হয় নাই। নির্বাচনের আগে মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। খুনি আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসরদের যদি বিচারের আওতায় না আনা হয়, তাহলে চব্বিশের শহীদদের সঙ্গে বেইমানি করা হবে।”
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, “নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যদি জুলাইয়ের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে ব্যর্থ হয় তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে এ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিজেরাই জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণা দেব।”
জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব ড. গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীকে একটি আদর্শিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন। ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের আহ্বান জানান।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, রফিকুল ইসলাম খান, মজলিসে শুরা সদস্য অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক শিবির নেতা সাদিক কায়েম, শিবির সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিন, দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কেট জসিমউদ্দিন সরকার, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মাওলানা মওদুদ হাসান প্রমুখ।



















