দেশের দরিদ্র এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা আগামী জুলাই মাস থেকে সপ্তাহে পাঁচ দিন দুপুরের খাবার পাবে। খাবার হিসেবে থাকছে দুধ, ডিম, পাউরুটি, বিস্কুটসহ নানা মৌসুমি ফল। সরকারের নিজস্ব অর্থে ১৫০ উপজেলায় এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার ১৫টি উপজেলায় দুটি পৃথক প্রকল্প চালু হচ্ছে।
এই দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৩ লাখের বেশি শিশু স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় আসবে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচির’ জন্য দুই হাজার ১৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার।
প্রকল্পের বিস্তারিত ও উদ্দেশ্য
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে এই স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়ন হবে। কার্যক্রমের শৃঙ্খলা রক্ষায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে স্থানীয়দের নিয়ে একটি কমিটি কাজ করবে। অন্তর্বর্তী সরকার সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি বাড়ানো, অপুষ্টির ঘাটতি কমানো এবং সফলভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হতে সহায়তার লক্ষ্যে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, “আমাদের টার্গেট আগামী জুলাই মাস থেকে এটি শুরু করা। সেটা যদি কোনো কারণে সম্ভব না-ও হয়, তাহলে আগস্ট থেকে শুরু করব। এরই মধ্যে সরকারের রাজস্ব ফান্ড ও বিশ্বব্যাংকের ফান্ডে পরিচালিত দুটি প্রকল্পের জন্য পিডি নিয়োগ হয়েছে। দুটি প্রকল্পই একসঙ্গে শুরু হবে। শিশুরা সপ্তাহের পাঁচ দিন দুপুরের খাবার পাবে।”
প্রকল্পের আওতা ও খাদ্য তালিকা
- সরকারি রাজস্ব তহবিল: সরকারের রাজস্ব তহবিলে পরিচালিত কর্মসূচিটি ৬২ জেলার ১৫০ উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলবে। এসব উপজেলার মধ্যে ৯১ শতাংশ (১৩৫ উপজেলা) অতি উচ্চ এবং উচ্চ দারিদ্র্যপ্রবণ। বাকি ১৪টি (৯ শতাংশ) উপজেলা নিম্ন দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা। গত বছর প্রকাশিত খানা আয়-ব্যয় জরিপ প্রতিবেদনের ম্যাপিংয়ের ভিত্তিতে দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। ৩১ লাখ ৩০ হাজার শিশু এই প্রকল্পের আওতায় আসবে।
- বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন: বিশ্বব্যাংকের অর্থে পরিচালিত প্রকল্পে কক্সবাজারের ৫৬৯ এবং বান্দরবানের ৪৩৬টি, মোট ১ হাজার ৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ ১১ হাজার শিক্ষার্থী সপ্তাহে পাঁচ দিন পুষ্টিকর বিস্কুট, কলা, বান, ডিম, দুধ পাবে। কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থানরত মায়ানমারের শিশুরাও এই সুবিধা পাবে।
কোন দিন শিশুরা কী খাবার পাবে, তা এরই মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে:
- রবিবার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার: একটি ডিম এবং ১২০ গ্রামের একটি বান।
- সোমবার: ২০০ এমএল ইউএইচটি দুধ ও একটি ১২০ গ্রামের বান।
- বুধবার: ৭৫ গ্রাম বিস্কুট ও ১০০ গ্রাম সাইজের একটি কলা অথবা মৌসুমি ফল।
প্রস্তাবিত সাপ্তাহিক খাদ্য তালিকায় এনার্জি ২৫.৯ শতাংশ, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ৩২.২ শতাংশ, প্রোটিন ১৬.৪ শতাংশ এবং ফ্যাট ২১.৭ শতাংশ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকল্পের গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু হলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা, ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির হার বাড়ানো, পড়ালেখায় মনোযোগ ধরে রাখাসহ সার্বিকভাবে শিক্ষার মানের উন্নয়ন হবে। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, “স্কুল ফিডিং প্রোগ্রামে ডিম, বান ও কলা লাগবে। এগুলো কিন্তু আমাদের প্র্যাকটিক্যালি নিড। আর্থিক কারণে অনেকে তার নিড পূরণ করতে পারে না। তাই স্কুল ফিডিং প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো, ‘শিশু দীর্ঘ সময় স্কুলে থাকবে, তারা দুপুরে কিছু খাবে, তার ক্ষুধা দূর হবে। আমাদের অন্য অনেক মাত্রা রয়ে গেছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো আমাদের শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে। এ প্রজেক্টে হেলথের কম্পোনেন্ট রয়েছে। শিশুরা যে অপুষ্টিতে ভোগে, সেটার কিছুটা রেমিডি হলো আমাদের স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম’।”
উল্লেখ্য, স্কুল মিল কর্মসূচির গুরুত্ব ও ফলাফল বিবেচনায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ২০০১ সালে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শুরু হয়। ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলে। ওই বছর থেকে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং নামে আলাদা একটি কর্মসূচি চালু হয়ে ২০২২ সালের জুনে শেষ হয়। তখন শিশুদের শুধু উচ্চমানসম্পন্ন বিস্কুট দেওয়া হতো।


















