সাইবার স্পেসে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানিতে পুরুষের দ্বিগুণ শাস্তির বিধান রেখে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করা হয়েছে। এই নতুন অধ্যাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর ৯টি ধারা বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে, আগের আইনের বেশ কিছু ধারার মামলা, দণ্ড ও জরিমানা বাতিল করা হয়েছে।
বুধবার (২১ মে) রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরীর সই করা এই অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ এটি অনুমোদন করেছিল।
অধ্যাদেশের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ব্ল্যাকমেলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটর্শন বা ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন করলে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে, এসব অপরাধ নারী বা অনূর্ধ্ব-১৮ বছরের কোনো শিশুর বিরুদ্ধে সংগঠিত করলে অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
সাইবার বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা কালবেলাকে বলেন, বর্তমানে পুরুষের বিরুদ্ধে সাইবার হয়রানি বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে আইনে কম পরিমাণ হলেও শাস্তির বিধান একটা ইতিবাচক দিক। ভবিষ্যতে চাহিদা অনুযায়ী এটি পরিবর্তন, পরিমার্জন করা যাবে।
নতুন এই অধ্যাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ধারা ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩৪ বাদ পড়েছে। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, উল্লিখিত ধারাগুলোয় নিষ্পন্নাধীন কোনো মামলা বা অন্যান্য কার্যধারা ও তদন্ত বাতিল হবে এবং কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। এছাড়া এসব ধারায় আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ড ও জরিমানা বাতিল হবে। বাদ পড়া ধারাগুলোর মধ্যে ছিল – মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে প্রচারণা; পরিচয় প্রতারণা; আক্রমণাত্মক বা মিথ্যা তথ্য প্রকাশ; অনুমতি ব্যতীত তথ্য সংগ্রহ; এবং মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত বিষয়াদি।
এই অধ্যাদেশে সাইবার সুরক্ষা বিষয়ে মোট ৯টি অধ্যায়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে এর শিরোনাম, সংজ্ঞা ও অন্যান্য বিস্তারিত রয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি’ এবং চতুর্থ অধ্যায়ে ‘জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল’ গঠনের বিস্তারিত বলা হয়েছে, যা এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হবে। পঞ্চম অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো, ষষ্ঠ অধ্যায়ে সাইবার বিষয়ক ‘অপরাধ ও দণ্ড’, সপ্তম অধ্যায়ে সাইবার ‘অপরাধের তদন্ত ও বিচার’ এবং অষ্টম অধ্যায়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ে বিশদ উল্লেখ রয়েছে। সর্বশেষ নবম অধ্যায়ে বিবিধ অংশে বলা হয়েছে, এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সরকার গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের আমলে সাইবার নিরাপত্তা আইনের কিছু বিতর্কিত ধারা এবং সেগুলোর অপব্যবহার নিয়ে জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। ফলস্বরূপ, আইনটি বাতিলের দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকার সেই দাবি আমলে নিয়ে আইনটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১ ডিসেম্বর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ একটি নতুন অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করে এবং ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে জনমত আহ্বান করা হয়। পরে এই খসড়ার কিছু ধারা নিয়ে সমালোচনা হলে সরকার আরও কিছু সংশোধনী আনে। সবশেষ গত ৬ মে উপদেষ্টা পরিষদ সংশোধিত খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। সেদিন এক সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে পুরো প্রক্রিয়ায় খসড়াটি ২৫ বার পরিবর্তন করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ তৈয়্যব আহমদ কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশের সাইবার স্পেসে নারী ও শিশুরা বেশি যৌন হয়রানি ও সেক্সটর্শনের শিকার। সে কথা মাথায় রেখেই নারীদের এখানে বেশি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এখানে নারী-পুরুষ তুলনাটা অপ্রাসঙ্গিক।



















