ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে নদ-নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি মোকাবিলায় পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা গেলে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের ক্রাউন প্লাজার বলরুমে ‘জাতীয় পানি সম্পদ সুরক্ষায় পদ্মা ব্যারাজের ভূমিকা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে দেশের নদ-নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ তার ন্যায্য পানির হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রচেষ্টার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত ধরে রাখা গেলে পদ্মার শাখা-উপশাখা নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে কৃষি উৎপাদন সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখা যাবে।
নদীতে পানিপ্রবাহ কমায় বাড়ছে উদ্বেগ
পদ্মা ও তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব তুলে ধরে রিজভী বলেন, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত হলেও নদীগুলোতে পর্যাপ্ত পানি থাকছে না। তিস্তা ও যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় নদীতে চর দেখা যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, গত ২০ থেকে ২৫ বছরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় বৃষ্টিপাতও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
তিনি আরও বলেন, পদ্মার শাখা-উপশাখা নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ঠেলে দূরে রাখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সুন্দরবনসহ বিভিন্ন এলাকার জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
রিজভীর মতে, পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষার পানি সংরক্ষণ ও শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়ানো গেলে এসব সমস্যা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগের তাগিদ
পানিবণ্টনকে শুধু কারিগরি বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয় হিসেবেও বিবেচনার আহ্বান জানান বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে জোরালো আলোচনা চালাতে হবে।
১৯৭৭ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির গ্যারান্টি ক্লজের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী প্রশ্ন করেন, পরবর্তী সময়ে সেটি কেন বাদ দেওয়া হয়েছিল। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও জোরালো অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতের কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধের উদাহরণ টেনে রিজভী বলেন, পানি বণ্টনের প্রশ্নে কোনো দেশই সহজে ছাড় দেয় না। তাই বাংলাদেশেরও নিজের ন্যায্য পাওনার বিষয়ে সোচ্চার থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, উজানে বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনা জোরদার করতে হবে।
দ্রুত ব্যারাজ নির্মাণের আহ্বান
পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে রিজভী বলেন, জলাধার নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষার পানি সংরক্ষণ এবং শাখা-উপশাখা নদীগুলোর পানিপ্রবাহ সচল রাখা সম্ভব হলে কৃষি উৎপাদন, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌপথের উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যাবে।
তিনি বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ও নৌযান চলাচলের সম্ভাবনাও সম্প্রসারিত হবে।
রিজভী আরও বলেন, প্রকল্পগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তের পর এখন দ্রুত বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের অর্থনীতি, কৃষি, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।


















