আগুন সন্ত্রাস, বোমা হামলা কিংবা তথাকথিত ‘মব সন্ত্রাস’—কোনো অপশক্তিই উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন থামাতে পারবে না বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সংগঠনটির নেতারা। দীর্ঘ পথচলায় নানা হামলা ও রক্তক্ষয়ী প্রতিকূলতার মুখেও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অঙ্গীকার থেকে পিছু না হটার কথা জানিয়ে তাঁরা বলেছেন, অন্যায়, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উদীচীর লড়াই অব্যাহত থাকবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নেব’ স্লোগানে বিকেল ৪টায় শুরু হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বর্ণাঢ্য আয়োজন। জাতীয় সংগীত ও সংগঠন সংগীতের মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকা এবং উদীচীর পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন বাউল শেখ জামাল উদ্দিন (টুনটুন ফকির) এবং সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবীবুল আলম।
অনুষ্ঠানে উদীচীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আবৃত্তিকার বদরুল আহসান খান এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সংগীতদলের সদস্য তাজিম সুলতানাকে সম্মাননা জানানো হয়।
আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, সংস্কৃতি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং অন্যায়, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার শক্তিশালী হাতিয়ার। সমাজ পরিবর্তন এবং প্রগতিশীল মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উদীচী দীর্ঘদিন ধরে সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
সংগঠনটির ওপর অতীতের বিভিন্ন হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে নেতারা বলেন, যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলায় শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা নিহত হয়েছিলেন। নেত্রকোনায়ও হামলায় প্রাণ হারান আটজন শিল্পী ও কর্মী। এ ছাড়া গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এত প্রতিকূলতার পরও উদীচীর আন্দোলন ও প্রতিবাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেন তাঁরা।
উদীচীর কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবীবুল আলমের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন বাউল শেখ জামাল উদ্দিন (টুনটুন ফকির), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফি রতন, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, লেখক ও গবেষক জাকির হোসেন, সুতপা বেদজ্ঞ, উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এবং ঢাকা মহানগর সংসদের সাধারণ সম্পাদক রুমি দে। উদ্বোধনী পর্ব সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান।
আলোচনা সভার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে ছিল বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন অনন্যা লাবণী পুতুল ও মাহমুদুল হাসান। অনন্দিতা খানের পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্য সংগঠন ‘অংশী’। বাউল গান পরিবেশন করেন টুনটুন ফকির। এ ছাড়া দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন ফারহান এহসান, আবৃতা, মায়েশা সুলতানা উর্বি এবং উদীচীর কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের শিল্পীরা।
তাজিম সুলতানার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠাকালীন ও বর্তমান প্রজন্মের সংগীতদলের শিল্পীদের যৌথ পরিবেশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর সত্যেন সেন ও রণেশ দাশগুপ্তের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গান, কবিতা, নাটক ও নৃত্যের মাধ্যমে প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলনে ভূমিকা রেখে আসছে সংগঠনটি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ঐতিহ্য ধরে রেখে আগামী দিনে অন্যায়, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন উদীচীর নেতাকর্মীরা।


















