ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছে ‘ইলিশ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্প। তবে প্রকল্প শেষে উৎপাদন বাড়ার পরিবর্তে উল্টো কমেছে ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। শুধু উৎপাদনই নয়, কমেছে ইলিশের আকার ও ওজনও। এদিকে ইলিশের ধারাবাহিক সংকটে বিপাকে পড়েছেন ভোলার দুই লক্ষাধিক জেলে ও ব্যবসায়ী। লোকসান আর ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে কেউ কেউ ছেড়েছেন বসতভিটা। এতে সংকুচিত হয়ে পড়ছে ইলিশকেন্দ্রিক অর্থনীতি।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্পটি শুরুর সময় দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল উৎপাদন বাড়িয়ে ৬ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত করা। কিন্তু প্রকল্প শেষে ইলিশ আহরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যের বিপরীতে কমেছে প্রায় ৬৫ হাজার মেট্রিক টন।
মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। তবে প্রকল্পের সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জেলে ও মৎস্যজীবী নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং যথাযথ তদারকির অভাবে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে।
ভোলার ইলিশা মাছঘাটের ব্যবসায়ী মো. হালান মাঝি জানান, প্রকল্পের আওতায় জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য গরু দেওয়ার কথা থাকলেও তা প্রকৃত জেলেদের হাতে পৌঁছায়নি। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের নির্ধারিত ব্যক্তিদের মধ্যে এসব গরু বিতরণ করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত জেলেরা সহায়তার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিনের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। তাঁর দাবি, কার্যক্রম ছিল অনেকটা লোকদেখানো। নদী থেকে অবৈধ জাল নির্মূল, মা ইলিশ রক্ষা এবং জাটকা সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির ভোলা সদর উপজেলা সভাপতি মো. এরশাদ ফরাজীও বরাদ্দের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর ভাষ্য, যেসব খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই কার্যকর ছিল না। অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের কারণে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি।
কমছে ইলিশ, সংকুচিত হচ্ছে ব্যবসা
একসময় মেঘনা নদীতে জাল ফেললেই ধরা পড়ত ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ। এই মাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ভোলার বিস্তৃত অর্থনীতি। মাছ ধরা, বেচাকেনা, আড়ত, বরফকল ও পরিবহন খাতে জড়িয়ে রয়েছেন হাজারো মানুষ। কিন্তু জেলে, জাল ও ট্রলারের সংখ্যা বাড়লেও ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোলার শিবপুর মাছঘাটের আড়তদার আরিফুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে তাঁর আড়তে ইলিশ বিক্রি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। জেলার অর্ধশত মাছঘাটের অনেকগুলোতেই একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এতে মাছ ধরার সরঞ্জাম ও নৌকায় বিনিয়োগ করা বিপুল অর্থ আটকে যাচ্ছে। পাশাপাশি জেলেদের দেওয়া অগ্রিম টাকা বা দাদন ফেরত না পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের লোকসান বাড়ছে।
আরিফুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌসুমে সাধারণত প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার সময়েও মেঘনা নদীতে ইলিশের উপস্থিতি ছিল কম। তাঁর দাবি, গত চার-পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ইলিশের পরিমাণ কমছে।
জেলার অন্যতম বৃহৎ মাছঘাট চরফ্যাশনের সামরাজ। ঘাটটিতে প্রায় ১২০টি আড়ত রয়েছে। নদী ও সমুদ্রের মাছ বেচাকেনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এই ঘাটেও ইলিশের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে।
সামরাজ ঘাটের ব্যবসায়ী মো. বাবুল জানান, ২০২৩ সালে তাঁর আড়তে ৮ কোটি টাকার ইলিশ বিক্রি হয়েছিল। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫ কোটি টাকায় এবং ২০২৫ সালে ৪ কোটি টাকায়। চলতি ২০২৬ সালে বিক্রির পরিমাণ নেমে এসেছে মাত্র ৫০ লাখ টাকায়।
তিনি বলেন, ইলিশের অভাবে পুঁজি হারিয়ে এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে তিনি। ব্যাংক ও মাছের মোকামে দেনা রয়েছে। এসব ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
সামরাজ ঘাটের ইলিশ চালানি আবুল কালাম জানান, ২০২১ সাল থেকে পরবর্তী তিন বছর ইলিশ চালানের পরিমাণ প্রায় একই ছিল। তবে এরপর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে ইলিশের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। এতে জেলে ও ব্যবসায়ীদের দেনার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।
দেনার চাপে ঘরছাড়া জেলেরা
ইলিশের সংকট শুধু ব্যবসায়িক লোকসানেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে জেলেদের ব্যক্তিগত জীবনেও। নদীতে মাছ না পেয়ে সংসার চালানো এবং মাছ ধরার খরচ জোগাতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
ভোলা সদর উপজেলার চর আনন্দ গ্রামের জেলে সিরাজ মাঝি মেঘনায় ইলিশ না পাওয়ায় আয় হারান। সংসার চালানো ও নদীতে মাছ ধরার খরচ মেটাতে গিয়ে মহাজন ও মুদিদোকানে তাঁর প্রায় ১০ লাখ টাকা দেনা হয়। পাওনাদারদের চাপ সামলাতে না পেরে একপর্যায়ে জন্মভিটা ছেড়ে চলে যান তিনি। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিরাজ ঢাকায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর ফেলে যাওয়া বাড়ি ও ভিটা পাহারা দিচ্ছেন পাওনাদারেরা।
একই গ্রামের মহসিন মীর প্রায় ১৬ লাখ টাকা দেনার চাপে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মাহমুদ মাঝির দেনা প্রায় ১১ লাখ টাকা এবং কামরুল মাঝির দেনা প্রায় ১০ লাখ টাকা। তাঁদের অভিযোগ, সাগরে ট্রলিং বোটের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ আহরণ এবং নিষিদ্ধ বেহুন্দি ও চরঘেরা জালের ব্যবহার ইলিশের সংকট বাড়াচ্ছে।
জেলেদের মতে, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণ বন্ধ করা না গেলে ইলিশের উৎপাদন


















