পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পে বালিশ কেনা ও তা খাটে তোলার অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল ২০১৯ সালে। আলোচিত এ দুর্নীতির ঘটনায় মামলা হলেও সাত বছর পেরিয়ে এখনও তদন্ত শেষ করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একের পর এক কমিশন পরিবর্তন হলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সংস্থাটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার দায় এড়াতে পারে না দুদক।
গত মে মাসে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় রূপপুরের বালিশকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বালিশের দাম ধরা হয়েছিল ৮০ হাজার টাকা। একজন স্বাভাবিক মানুষও চিন্তা করতে পারেন, পৃথিবীতে কখনো কোনো বালিশের দাম ৮০ হাজার টাকা হতে পারে কি না।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পে অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বালিশটি জাদুঘরে রাখার কথাও বলেন।
তবে আলোচিত এ ঘটনার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতারা একে দুদকের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।
দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা জজ ড. শাহজাহান সাজু বলেন, এ ঘটনায় প্রামাণ্য নথি থাকার পরও দুদক তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্র জমা দিতে পারেনি। তাঁর মতে, এত দীর্ঘ সময়েও তদন্ত শেষ না হওয়া সংস্থাটির ব্যর্থতা।
২০১৯ সালে রূপপুর প্রকল্পের আবাসন সামগ্রী কেনাকাটায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে এ ঘটনায় চারটি মামলা করে দুদক। অভিযোগের ভিত্তিতে ১৩ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, একটি বালিশ কেনার দাম দেখানো হয়েছিল ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। সেটি খাটে তোলার মজুরি ধরা হয়েছিল ৭৬০ টাকা। এ ছাড়া একটি কমফোর্টারের দাম দেখানো হয় ১৬ হাজার ৮০০ টাকা এবং বিদেশি চাদরের দাম ধরা হয়েছিল প্রায় ৬ হাজার টাকা। বাজারমূল্যের তুলনায় এসব পণ্যের অস্বাভাবিক দাম দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৩১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় করা চারটি মামলায় দুই ঠিকাদার ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১১ প্রকৌশলীসহ মোট ১৩ জনকে আসামি করা হয়। সে সময় দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পর মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং পরে আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের মেয়াদ শেষ হলেও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
বর্তমানে দুদকের চেয়ারম্যান এ কে এম আসাদুজ্জামান। ২০২৬ সালের অক্টোবরেও আলোচিত এ মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে দুদকের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, নতুন কমিশনের অধীনে মামলাগুলোর তদন্তে গতি আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুদকের মহাপরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন বিষয়ে অনুসন্ধান এবং সাক্ষীদের বক্তব্য নিতে হয়। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য সামনে এলে তা জানানো হবে। তবে মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
অন্যদিকে, দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার জন্য সংস্থাটির সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, বছরের পর বছর তদন্তের কথা বলা হলেও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। একাধিকবার সরকার ও কমিশন পরিবর্তনের পরও তদন্ত শেষ না হওয়াকে তিনি অনিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে এ ঘটনায় অভিযুক্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ইতিমধ্যে অবসরে গেছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এ মামলার তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।


















