মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। একই সঙ্গে রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে নেওয়ার পক্ষে সাফাই দিয়ে তিনি বলেছেন, নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত অস্ত্রটি হাতে রেখেছিলেন। তবে সেদিন তিনি কোনো ভুল করেননি বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ইশরাক হোসেন।
অস্ত্রকাণ্ডের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগে আমি দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি। আমি কেবল আমার নিরাপত্তার জন্য আমার হাতে অস্ত্রটুকু যতটুকু সময় প্রয়োজন রেখেছিলাম, পরবর্তীকালে সেটি আর আমার দৃশ্যমান হয়নি।’
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, সোমবার থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন তিনি। ঢাকা-৬ আসনসহ আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূল এবং জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে কাজ করতে চান। প্রধানমন্ত্রী তাঁর এ প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ইশরাক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তাঁকে প্রথম মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছিলেন। দেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পেরে তিনি গর্বিত। তবে সাম্প্রতিক অস্ত্রকাণ্ড নিয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন সম্পর্কে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন।
গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘরে মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয়ে ইশরাক বলেন, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী থানা-পুলিশকে অবহিত করেই তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁর লাইসেন্স করা অস্ত্র সব সময় কোমরে থাকে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলা ও নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই তিনি অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওর মাধ্যমে মাদকাসক্তদের হাতে অস্ত্র না থাকার বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ঘটনার পর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী ১৩টি স্থান পরিদর্শন করেছিলেন, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রম আড়ালে পড়ে গেছে বলে মনে করেন তিনি।
ইশরাক আরও বলেন, পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরেন এবং নিজের পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানান। তাঁর কর্মকাণ্ডের কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রম যেন ম্লান না হয়, সে বিবেচনা থেকেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। তবে মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের আগে বেলা পৌনে দুইটার দিকে নেতা-কর্মীদের নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে প্রবেশ করেন ইশরাক। এ সময় তাঁর অনুসারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। বেলা দুইটার দিকে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়।
পরে সংবাদ সম্মেলন শেষে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রেসক্লাবের প্রাঙ্গণে যান ইশরাক। সেখানে গাড়িতে উঠে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন এবং গাড়ির ছাদ খুলে হ্যান্ডমাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। বেলা ২টা ৫৬ মিনিটের দিকে প্রেসক্লাব এলাকা ছাড়েন তিনি। তাঁর গাড়ি শিক্ষা ভবন হয়ে সচিবালয়ের দিকে যায় এবং পরে জিরো পয়েন্ট হয়ে গোপীবাগের দিকে অগ্রসর হয়।
এর আগে গত রোববার সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সূত্রগুলোর দাবি, রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে নিয়ে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘরে মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
সমালোচনার মুখে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেছিলেন, তিনি মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে ওই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রোববার রাতে ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হলে তিনি ফেসবুক পোস্ট ও হোয়াটসঅ্যাপে অডিও বার্তার মাধ্যমে সেটিকে ‘গুজব’ বলে দাবি করেন। তাঁর প্রেস কর্মকর্তাও খবরটিকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রতিবাদ জানান। তবে সোমবার সকাল সাড়ে আটটার পর নিজের ফেসবুক পেজে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। পরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার কথা জানান তিনি।


















