পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক ও গবেষক নাদিম মাহমুদ। একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষবিদায়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াকে লজ্জাজনক উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, যে রাষ্ট্র একজন মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দিয়ে সম্মান জানায়, সেই রাষ্ট্র তাঁর মর্যাদাপূর্ণ দাফন নিশ্চিত করতে কেন দীর্ঘ সময় নেয়, তা ভাবার বিষয়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী কলামে এসব কথা লিখেছেন নাদিম মাহমুদ। ‘মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে এই অসম্মান কেন’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখায় তিনি এ ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
কলামে বলা হয়, পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী ৮৭ বছর বয়সে গত ২৪ অক্টোবর মারা যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নাদিম মাহমুদের বর্ণনা অনুযায়ী, মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে পড়ে। পরে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বাধার কারণে তাঁর দাফন প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিলম্বিত হয় বলেও কলামে উল্লেখ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা নিয়ে প্রশ্ন
লেখক তাঁর কলামে উল্লেখ করেন, মানিক পশারীর কবর খুঁড়তে তাঁর মেয়ে ও বোনকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। বিষয়টিকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন মানুষ যিনি একসময় দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া সমাজের মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
নাদিম মাহমুদ প্রশ্ন তোলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধার দাফন কেন দিনের আলোয় স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হলো না এবং কেন তাঁকে রাতের আঁধারে পুলিশি পাহারায় সমাহিত করতে হলো। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও মৃত্যুর পর একজন মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাঁর দাফনে বাধা না দেওয়া মানবিকতার মৌলিক শিক্ষা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা
কলামে লেখক উল্লেখ করেন, মানিক পশারী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে তাঁর দাফন ঘিরে স্থানীয় জামায়াত নেতা-কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নাদিম মাহমুদ।
তিনি লেখেন, জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা বাধা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে দলটির দায়িত্বশীল নেতৃত্বের উচিত অবস্থান পরিষ্কার করা এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
লেখকের মতে, রাজনৈতিক বিরোধের কারণে একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষবিদায় বাধাগ্রস্ত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্বাধীনতার চেতনার প্রতি সম্মান দেখানোর বিষয়টিও তিনি সামনে আনেন।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন
নাদিম মাহমুদ তাঁর লেখায় রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদাপূর্ণ দাফন নিশ্চিত করতে কেন দীর্ঘ সময় লাগল, কেন পুলিশি পাহারায় দাফন করতে হলো—এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
লেখকের মতে, মুক্তিযোদ্ধারা দেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের জীবনের শেষ সময়ে এবং মৃত্যুর পর সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। রাজনৈতিক বিরোধ যেন কোনোভাবেই মানবিক মর্যাদা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছাপিয়ে না যায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
কলামের শেষাংশে নাদিম মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যদি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিজের মাটিতে সম্মানের সঙ্গে সমাহিত করতে বাধার মুখে পড়তে হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক মূল্যবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।


















