বৃহস্পতিবার , ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. জাতীয়
  2. ভিডিও
📢 এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন
বিজ্ঞাপনের আকার সর্বোচ্চ: 1080 × 200 px

সরকারি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রাচার ও শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদক
Sabiha Sultana
অক্টোবর ২২, ২০২৬ ২:৩১ অপরাহ্ণ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে করমর্দনের সময় রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনারের আচরণ নিয়ে বিতর্কের পর সরকারি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রাচার, শিষ্টাচার ও পেশাদারত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল মেনে চলার পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজেও সংযত ও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফর শেষে বিদায়ের সময় গত মঙ্গলবার শাহ মখদুম বিমানবন্দরে প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে করমর্দন করছিলেন। একপর্যায়ে তিনি রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলীর দিকে হাত বাড়ান। এ সময় করমর্দনের সময় বিভাগীয় কমিশনার এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে অন্য হাত দিয়ে পেছন থেকে প্রধানমন্ত্রীকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। তখন প্রধানমন্ত্রী কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে তাঁকে লাইনে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন।

ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভাগীয় কমিশনারের আচরণ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। অনেকে একে রাষ্ট্রাচার ও প্রটোকলবহির্ভূত আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ওই দিনই ইউসুফ আলীকে বিভাগীয় কমিশনারের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।

অন্য ঘটনাতেও আলোচনায় কর্মকর্তাদের আচরণ

শুধু রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনারের ঘটনাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে আরও কিছু ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে বাগেরহাটে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে একাধিকবার মুঠোফোন বেজে ওঠা ও কথা বলার কারণে জেলার সিভিল সার্জনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

এসব ঘটনার পর সরকারি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রাচার ও শিষ্টাচার সম্পর্কে ধারণা এবং কর্মক্ষেত্রে তার চর্চা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নির্ধারিত রীতি অনুসরণের পাশাপাশি দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজেও সংযত, ভদ্র ও পেশাদার আচরণ গুরুত্বপূর্ণ।

তবে একটি বা কয়েকটি ঘটনা দিয়ে পুরো প্রশাসনের আচরণগত মান বিচার করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

চাটুকারিতা নিয়ে সাবেক সচিবের সমালোচনা

সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘খোলামেলা কথা’ শিরোনামে নিয়মিত সরকার ও প্রশাসনের নানা অসংগতি নিয়ে লেখেন।

গতকাল বুধবার দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এক সময় সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের রাষ্ট্রাচার, শিষ্টাচার, পরিমিতিবোধ, শৃঙ্খলা, সময়নিষ্ঠা, লেখাপড়ার মান, পেশাদারত্ব ইত্যাদির মান ছিল নজরকাড়া সেরা। চলন-বলনেও চৌকসত্ব ছিল। কিন্তু এখন সবকিছুই তলানিতে।’

পোস্টে তিনি আরও লেখেন, ‘এখন ব্যক্তিত্ব রক্ষা করে চলার, আত্মমর্যাদাবোধ সমুন্নত রাখার, কোনো কিছুই বিবেচনায় নেই। এখন দৃষ্টিকটুভাবে চাটুকারিতা, শ্রুতিকটুভাবে চামচাসুলভ কথা বলা হয়।’

নিজের প্রশিক্ষণজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাবেক এই সচিব লেখেন, ১৯৮৩ সালে বনিয়াদি প্রশিক্ষণে তাঁকে শেখানো হয়েছিল, করমর্দনের ক্ষেত্রে জুনিয়র আগে হাত বাড়াবেন না; সিনিয়র হাত বাড়ালে তবেই করমর্দন হবে।

তাঁর ভাষায়, ‘এটা ছোট-বড়র বিষয় নয়। এটা শৃঙ্খলা, রীতিনীতি ও সংযমের বিষয়।’

রাষ্ট্রাচার ও শিষ্টাচারের পার্থক্য কী

রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত নির্ধারিত রীতিনীতিকে বলা হয় রাষ্ট্রাচার বা প্রটোকল। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান পরিচালনা, অভ্যর্থনা, আসনবিন্যাস, পরিচয় করিয়ে দেওয়া, বক্তব্য দেওয়ার ক্রম এবং আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মতো বিষয় এর আওতায় পড়তে পারে।

রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে এসব নিয়মের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পদমর্যাদা ও অনুষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী প্রটোকল অনুসরণ করা হয়।

অন্যদিকে, শিষ্টাচার হলো ব্যক্তির ভদ্রতা, সৌজন্য, সংযম ও অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আচরণ। কারও কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অনুমতি নিয়ে কথা বলা, অন্যকে অযথা বাধা না দেওয়া, আনুষ্ঠানিক পরিবেশে সংযত থাকা এবং মতভেদ হলেও শালীন ভাষায় কথা বলা শিষ্টাচারের অংশ।

দুটি বিষয় পরস্পরসম্পর্কিত হলেও এক নয়। রাষ্ট্রাচারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। অন্যদিকে, শিষ্টাচার নির্ভর করে সামাজিক ও পেশাগত রীতি এবং পরিস্থিতি বুঝে আচরণ করার ওপর।

তাই কোনো আচরণ রাষ্ট্রাচারবিরোধী কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের নিয়ম ও প্রটোকল বিবেচনা করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত সৌজন্যের কোনো রীতিকে সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সরকারি বিধি হিসেবে দেখাও যথাযথ নয়।

প্রশিক্ষণে শেখানো হয় রাষ্ট্রাচার ও অফিস শিষ্টাচার

বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে (বিপিএটিসি) বনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স করা বাধ্যতামূলক। এ প্রশিক্ষণে আচরণবিধি, আদর্শ, মূল্যবোধ, অফিস শিষ্টাচার এবং রাষ্ট্রাচারের নিয়মাবলি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

এ ছাড়া বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের নবনিযুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য পাঁচ মাস মেয়াদি ‘আইন ও প্রশাসন কোর্স’ রয়েছে। এ কোর্সে ফৌজদারি আইন, জনপ্রশাসন, ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, ইংরেজি ভাষা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আচরণগত বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বেসামরিক চাকরির আচরণবিধি, আদর্শ ও মূল্যবোধ সম্পর্কেও ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

প্রশিক্ষণে রাষ্ট্রাচার ও শিষ্টাচারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার পরও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে এসবের প্রয়োগ কতটা হচ্ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব, সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে এসব মূল্যবোধের চর্চাও গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: প্রকাশের আগে বিভাগীয় কমিশনারকে প্রত্যাহারের সরকারি আদেশ, ঘটনার ভিডিও এবং প্রশিক্ষণ কোর্সের মেয়াদ ও পাঠ্যক্রম নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করে নেওয়া ভালো।

সর্বশেষ - শিক্ষা